শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

উত্তরবঙ্গের বন্যা ও জলাবদ্ধতার দিকে 

নজর দেয়া প্রয়োজন

অতিবর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে এবার বেড়েছে তিস্তা নদীর পানি। প্রবল স্রোতে রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নদীগুলোতে দেখা দিয়েছে ভাঙ্গন। এছাড়া সম্প্রতি দুই দফায় ভারতের গজলডোবা বাঁধ দিয়ে প্রায় à§§à§§ হাজার কিউসেক পানি ছেড়েছে ভারত। বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, এই বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে উজানের দেশ ভারত আগে থেকে ভাটির দেশ বাংলাদেশকে কিছুই জানায়নি। 

ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই একবার ফেনী, নোয়াখালি, কুমিল্লা ও লক্ষীপুরে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছিল। সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা নিয়ে সরকার সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। বন্যা আক্রান্ত মানুষগুলো এখন পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। অথচ পূর্ববর্তী সেই বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে আবার প্লাবিত হলো দেশের উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তবে, হতাশার জায়গা হলো, এবারের বন্যা অনেকটা ব্ল্যাকআউট পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। দু’বছর আগের সিলেটের বন্যা, কিংবা সাম্প্রতিক সময়ের ফেনীর বন্যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মূলধারার মিডিয়ায় যেভাবে কভারেজ পেয়েছে উত্তরবঙ্গের বন্যা ততটা পায়নি। হয়তো উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি ততটা ভয়াবহ হয়নি, তারপরও যতটুকু মনোযোগ পাওয়ার কথা ছিল, এবারের বন্যা তা পায়নি। ফলে, প্রশাসনিক তৎপরতা ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতার পরিমাণও বিগত সময়ের বন্যার তুলনায় এখনো পর্যন্ত বেশ কম।

হঠাৎ করে বন্যার কারণে অনেকেই ঘর-বাড়ি ছেড়ে গবাদি পশুসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে সড়ক ও বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট। উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি কিছুটা কমেছে, যদিও আগের দিন বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের আট উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দী। লালমনিরহাট সদরের তিস্তা রেলস্টেশনের কাছে রেললাইনে পানি ওঠায় লালমনিরহাট-ঢাকা ট্রেন চলাচল পর্যন্ত ব্যাহত হয়েছে। দুর্গত এলাকার আমন ও শাকসবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, উজানে তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় পানিপ্রবাহ কমলেও ভাটি এলাকা কাউনিয়ায় আরও বাড়তে পারে। তবে পানি নামতে শুরু করলে আবার নদী পাড়ে ভাঙন বাড়ে। এ কারণে ওই এলাকার নদী পাড়ের মানুষ ভাঙন আতঙ্কে আছেন।

সচেতন মহলের কারো কারো ধারণা, এদিকে স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার পর বারবার বন্যার কবলে পড়ছে দেশ। অনেকে মনে করছেন, আগের সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক খুব বেশি ভালো থাকায় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী এখনো ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার কারণে অনেকটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই ভারত একাধিকবার একেক অঞ্চলের বাঁধ উন্মুক্ত করে দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। এই অভিযোগ বা মন্তব্যের সত্যতা যাচাই করার আসলে কোনো সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এই বন্যাগুলোকে কৃত্রিম পদ্ধতিতে সৃষ্ট বন্যা হিসেবে বিবেচনা করতে রাজি নন।

তাদের মতে, উত্তরবঙ্গে যে বন্যা চলছে তা অসময়ের বন্যা নয়। টানা কয়েকদিন আমাদের এখানেও বৃষ্টি হয়েছে, উজানে পাহাড়েও বৃষ্টি হয়েছে। ফলে অতিবৃষ্টির কারণে এই বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে অন্য কিছুর কোনো সম্পর্ক নেই। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, রংপুর বিভাগ ও তৎসংলগ্ন উজানে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে এসেছে। ফলে, আগামী তিন দিনের মধ্যে তিস্তা নদীর ‘পানি সমতল’ কমতে শুরু করবে। অপরদিকে ধরলা ও দুধকুমার নদের ‘পানি সমতল’ আগামী à§§à§® ঘণ্টায় স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং পরবর্তী দুই দিন হ্রাস পেতে পারে। আগামী ১২ ঘণ্টায় লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা নদী সংলগ্ন চরাঞ্চল এবং কতিপয় নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থেকে পরবর্তীতে উন্নতি হতে পারে বলেও তারা আশা করছেন।

আমরাও আশা করবো বন্যা পরিস্থিতির আশু উন্নতি হবে। তাছাড়া বারবার বন্যা কেন হচ্ছে এ বিষয়টিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যাচাই করার চেষ্টা করবেন। তবে, সবকিছুর আগে প্রয়োজন অবহেলিত উত্তরবঙ্গের দুর্যোগ আক্রান্ত অসহায় মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এ ব্যাপারে প্রশাসন ও নাগরিক- উভয় মহলেই আরো বেশি সচেতনতা ও সক্রিয়তা কাম্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ